June 27, 2026, 3:53 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে সংবর্ধনা / ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস পেঁয়াজের দামে হঠাৎ ধস, মন ভেঙে পড়েছে উৎপাদনে শীর্ষ দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরের ৭ জেলার কৃষকের এনআইডি নবায়ন বাধ্যতামূলক কেন করতে চায় ইসি? যেসব কারণে আসছে নতুন ভাবনা দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, আবার চালু হচ্ছে ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা কুষ্টিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলিসহ যুবক আটক, গণপিটুনির পর পুলিশের হাতে সোপর্দ মেহেরপুর সীমান্তে ৭ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা, বিজিবির সতর্কতায় ব্যর্থ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও কমেছে, স্বস্তির আভাস জ্বালানি বাজারে ধানমন্ডি ৩২-এ জামায়াতের মিছিল শেষে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, আহত ১ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা/ ১,২০০ কোটি ডলার অবমুক্ত, হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন অগ্রগতি পাকশী রেলওয়ে জেলা পুলিশের মাসিক কল্যাণ ও অপরাধ সভা অনুষ্ঠিত

পেঁয়াজের দামে হঠাৎ ধস, মন ভেঙে পড়েছে উৎপাদনে শীর্ষ দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরের ৭ জেলার কৃষকের

শুভব্রত আমান/
দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনে শীর্ষ দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরের ৭ জেলার কৃষকদের মধ্যে পণ্যটির ভালো ফলনের আনন্দে ধ্বস নেমেছে; সেখানে দেখা দিয়েছে হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস। যে পেঁয়াজ ঘরে তুলে লাভের স্বপ্ন দেখেছিলেন কৃষকরা, সেই পেঁয়াজই এখন তাদের জন্য বড় লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে পেঁয়াজের দামে এমন ধস নেমেছে যে উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠছে না। একেকজন কৃষক মণপ্রতি গড়ে প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করছেন, আবার কেউ কেউ ক্ষোভে বাজার থেকে পেঁয়াজ ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার প্রতিবাদে এক কৃষক নদীতে পেঁয়াজ ফেলে দিয়েছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার অনুকূল আবহাওয়া এবং হাইব্রিড জাতের আবাদ বৃদ্ধির কারণে পেঁয়াজ উৎপাদনে শীর্ষ দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরের ৭ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলাগুলো হলো দক্ষিণ-পশ্চিমের কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী এবং উত্তরের রাজশাহী ও পাবনা। এর বাইরেও রয়েছে নাটোর ও মেহেরপুরের মতো জেলা।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, জেলাগুলো থেকেই প্রতি বছর দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক পেঁয়াজ আসে। চলতি মৌসুমে এসব জেলায় প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো ফলনের কারণে এখান থেকে প্রায় ১৯ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশে বছরে পেঁয়াজের মোট চাহিদা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টন। এ বছর সারা দেশে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩২ লাখ টন।
পেঁয়াজ উৎপাদনে দেশের শীর্ষে রয়েছে পাবনা। চলতি মৌসুমে জেলায় ৪৫ হাজার ৬৬৫ হেক্টর জমিতে চাষ করে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ফরিদপুর প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ করে প্রায় ৬ লাখ টন উৎপাদন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের এই সাত জেলায় স্থাপিত ২৮৫টি মডেল পেঁয়াজ সংরক্ষণঘরের প্রতিটির ধারণক্ষমতা ২৫০ থেকে ৩০০ মণ। এসব সংরক্ষণঘরে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার টন পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, নিকটেই ধানের আবাদের মৌসুম। অর্থের প্রয়োজনে কৃষকরা এই পেঁয়াজ এখন বাজারে বিক্রি করতে আনছেন।
কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ী জেলার কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে উৎপাদন মৌসুমের মার্চ মাস থেকে এসব বাজারে পেঁয়াজের দাম মণপ্রতি স্তরভেদে একহাজার টাকার উপরে ছিল। কিন্তু দামে হঠাৎ ধ্বস নেমেছে। এ দাম স্তরভেদে নেমে এসেছে ৮০০ টাকার নিচে।
রাজবাড়ীর সবচেয়ে বড় পেঁয়াজের মোকাম বালিয়াকান্দি উপজেলার সোনাপুর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে মানভেদে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায়। অথচ কৃষকদের দাবি, উৎপাদন, পরিচর্যা, সেচ, সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয় মিলিয়ে এক মণ পেঁয়াজ ঘরে তুলতে তাদের খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মণেই গড়ে প্রায় ৫০০ টাকা লোকসান হচ্ছে।
এ বছর রাজবাড়ী জেলায় ৩০ হাজার ৪৭৮ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলন ভালো হয়েছে।
সোনাপুর বাজারেই দেখা হয় কৃষক পলাশ মিয়ার সঙ্গে। সম্প্রতি তার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে ভ্যানভর্তি পেঁয়াজ নদীতে ফেলে দিচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যখন মাঠ থেকে পেঁয়াজ তুলেছি, তখন মণপ্রতি এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকা দাম ছিল। এখন সেই পেঁয়াজ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এত কম দামে বিক্রি করে তো উৎপাদন খরচই উঠছে না।”
তিনি জানান, বাজারে আনা পেঁয়াজের মান কিছুটা কম হওয়ায় কোনো ব্যবসায়ী কাঙ্ক্ষিত দাম বলেননি। ক্ষোভ ও হতাশা থেকেই তিন বস্তায় থাকা প্রায় চার মণ পেঁয়াজ নদীতে ফেলে দেন।
একই বাজারে কৃষক দিদার হোসেন বলেন, “এ বছর সারের দাম, তেলের দাম, শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুই অনেক বেড়েছে। এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন করতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। এখন যে দাম পাচ্ছি, তাতে খরচই উঠছে না।”
কৃষক রুহুল কুদ্দুস সালেহ বলেন, লোকসানের পাশাপাশি সংরক্ষণ করাও এখন নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেঁয়াজ যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য ঘরে সার্বক্ষণিক ফ্যান চালিয়ে রাখতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ বিলও আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তিনি বলেন, “সরকার যদি বাজারে হস্তক্ষেপ করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করে, তাহলে আগামী বছর পেঁয়াজের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শহিদুল ইসলাম বলেন, বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমেছে।
এই কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত হিমাগার বা আধুনিক গুদাম না থাকায় পচনশীল এ পণ্য দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব হয় না। ফলে পচনের আশঙ্কায় কৃষক বাধ্য হয়ে থাকেন পেয়াজ বিক্রি করে দিতে।
অনুসন্ধান বলছে, এবারের মৌসুমে বৃষ্টির প্রভাবও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কৃষকদের ভাষ্য, পেঁয়াজ তোলার সময় বৃষ্টিপাত হওয়ায় অনেক পেঁয়াজে আর্দ্রতা বেড়ে গেছে। এতে সংরক্ষণক্ষমতা কমে গেছে এবং দ্রুত পচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই অনেক কৃষক লোকসান জেনেও দ্রুত বাজারে পণ্য ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রতিবছর একই ধরনের সংকটের মূল কারণ হলো উৎপাদন পরিকল্পনার অভাব, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাজেদুল হক কৃষক যখন উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য পান না, তখন তারা লোকসানে পড়েন। আবার পরের বছর আবাদ কমে গেলে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয় এবং দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারি পর্যায়ে সংরক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পেঁয়াজ সংগ্রহ এবং বাজার তদারকি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেন, সময়ের সঙ্গে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net